চীনে উইঘুর মুসলিম বন্দিশিবির: উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক গণহত্যা? - Bd Online News 24
Home » আন্তর্জাতিক » চীনে উইঘুর মুসলিম বন্দিশিবির: উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক গণহত্যা?

চীনে উইঘুর মুসলিম বন্দিশিবির: উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক গণহত্যা?

গত বছরের আগস্টে জাতিসংঘের একটি মানবাধিকার কমিটি বলেছিল, চীন অন্তত ১০ লাখ উইঘুর মুসলমানকে ‘কাউন্টার-এক্সট্রিমিজম সেন্টারে’ বন্দী করে রেখেছে বলে তারা জানতে পেরেছে। জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণবিষয়ক ওই কমিটির একজন সদস্য গে ম্যাকডুগাল এ দাবি করেছিলেন। জেনেভায় চীনের ওপর দুই দিনব্যাপী এক আলোচনার সময় তিনি এ দাবি করেছিলেন।

উইঘুর হচ্ছে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়। সেখানকার জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশই এ সম্প্রদায়ের। তিব্বতের মতো এই জিনজিয়াংও চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃত। উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুসলমানদেরকে গত কয়েক মাস ধরেই ব্যাপকহারে আটক করছে চীন সরকার। উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি অনলাইনে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

একটি গবেষণার বরাতে এই প্রতিবেদনটি করেছেন বিবিসি প্রতিনিধি জন সুডওয়ার্থ। প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য তা ভাষান্তর করা হলো:
নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশটির পশ্চিমাঞ্চল জিনজিয়াংয়ের মুসলিম শিশুদের তাদের পরিবার, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। একটি শিক্ষাশিবির। একই সময়ে হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমকে বৃহদাকার বন্দিশিবিরে আটকে রাখছে। এ ছাড়া খুব তড়িগড়ি করে এবং ব্যাপক প্রচারণার মধ্য দিয়ে আবাসিক স্কুলও নির্মাণ করছে।

এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আছে এমন তথ্য-উপাত্ত ও বিদেশে অবস্থানরত বেশ কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি বেশকিছু প্রমাণ বিবিসির হাতে রয়েছে। যা থেকে বোঝা যায়, ওই অঞ্চলে শিশুদের সঙ্গে প্রকৃত অর্থেই কি ঘটছে। ওইসব তথ্য প্রমাণ এটাই নির্দেশ করে যে, একটি শহরেই কেবল ৪০০ শিশু হারিয়ে গেছে। কেবল তাই নয় তাদের বাবা-মাকেও বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তাদের বন্দিশিবির বা কারগারেও নেওয়া হতে পারে। আর সরকারের পক্ষে এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলা হয়েছে কি না, এই শিশুদের ‘কেন্দ্রীয় পরিচর্যার’ প্রয়োজন।

ওই তথ্য থেকে আরও দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের তাদের পূর্বপুরুষের পরিচয় বদলে ফেলার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি শিশুদেরও তাদের শেকড় থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে চীন কর্তৃপক্ষ। জিনজিয়াংয়ে চীনের কঠোর নজদারি ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সেখানে বিদেশি সাংবাদিককে দিনের ২৪ ঘণ্টাই নজরদারি করা হয়। তাই সেখান থেকে কোনো প্রমাণ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব। তবে তুরস্কে এটা পাওয়া যায়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাষাগত দিক থেকে তারা তুরস্কের মিত্র। হাজার হাজার উইঘুর সদস্য পড়াশোনা অথবা ব্যবসা করতে তুরস্কে আসে।

শিক্ষাশিবিরে থাকার ব্যবস্থা। এই যেমন ইস্তাম্বুলে অবস্থিত বড় একটি হল রুমে কয়েকশ’মানুষ লাইন ধরেছিল তাদের অসহায়ত্বের গল্প বলতে। যাদের অধিকাংশই সন্তানের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যারা জিনজিয়াংয়ে থেকে নিখোঁজ হয়েছে। এক মা তার তিন মেয়ে শিশুর ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘আমি জানি না তাদেরকে এখন কারা দেখভাল করছে। তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই আমার।’ আরেক মা তিন শিশু ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের ছবি ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি শুনেছি তাদেরকে এতিমখানায় নেওয়া হয়েছে।’

আলাদা আলাদা নেওয়া অন্তত ৬০টি সাক্ষাৎকারে বাবা-মা ও অন্য আত্মীয়রা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে জিনজিয়াং থেকে নিখোঁজ ১০০ শিশুর বিষাদময় বর্ণনা দেন। এরা সবাই চীনের সবচেয়ে বড় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল জিনজিয়াংয়ের বাসিন্দা উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলিম। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাষাগত দিক থেকে তারা তুরস্ককে বন্ধু মনে করে। হাজার হাজার উইঘুর সদস্য পড়াশোনা অথবা ব্যবসা করতে তুরস্কে আসে। কেউবা আবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসে। আবার অনেকে চীনের জন্ম নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রমের ভয় ও ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় চাপ থেকে বাঁচতে আসে।

কিন্তু গত তিন বছর ধরে হাজার হাজার উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের যখন চীন বিশাল বন্দিশিবিরে আটকে রাখতে শুরু করলো, তখন তারা বুঝতে পারলো আসলে তারা ফাঁদে পড়েছেন। শিক্ষাশিবিরে খাওয়ার ব্যবস্থা। চীন বলছে, উইঘুররা যাতে ধর্মীয় চরমপন্থা অবলম্বন করে সহিংস না হয় সে জন্য তাদের ‘কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে’ শিক্ষিত করা হচ্ছে। কিন্তপ্রমাণ বলছে, অধিকাংশকে আটকে রাখা হয়েছে কেবল ধর্মের প্রতি আনুগত্যতা প্রকাশে প্রার্থনা অথবা ওড়না, অথবা তুরস্কের মতো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে।

তুরস্কে থাকা উইঘুরদের দেশে ফিরে যাওয়া মানে নিশ্চিত কারাবরণ করা। ফোনে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন তাদের। এমনকি জিনজিয়াংয়ে অবস্থানরতদের বিদেশে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলাও খুবই বিপজ্জনক। এক ব্যক্তি জানায়, তার স্ত্রী ফিরে যাওয়ার পরই আটক করা হয়। তিনি তার আট সন্তান নিয়ে ভয়ে আছেন এবং তিনি ধারণা করছেন তার সন্তানরা এখনো চীনা সরকারের কব্জায় আছে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা তাদেরকে শিশু শিক্ষা শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

বিবিসি কর্তৃক পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় ওই শিশুদের এবং অন্য হাজারো শিশুদের ভাগ্যে প্রকৃতপক্ষেই কী ঘটেছে তার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। ড. আদ্রিয়ান জেনজ হলেন একজন জার্মান গবেষক। জিনজিয়াংয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমদের গণহারে আটকের বিষয়টি বিস্তারিত প্রকাশের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত। প্রকাশ্যে পাওয়া যায় এমন সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করে তার দেওয়া প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, জিনজিয়াংয়ে অভিনব এবং বিশালাকৃতির এক স্কুল পরিচালনা করছে চীন।

স্কুলের ক্যাম্পাসও বিশাল বড়, পাশাপাশি ব্যাপক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ডরমেটরিও নির্মাণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশটি লাখ লাখ শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের কব্জায় রাখার সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করছে। পাশাপাশি তারা বন্দিশিবিরও নির্মাণ করছে। সবমিলিয়ে এটাই মনে হয়েছে যে, তারা এগুলো করছে উইঘুর মুসলিমদের জন্যই।

শিক্ষাশিবিরের ক্লাসরুম। ২০১৭ সালে মাত্র এক বছরে জিনজিয়াংয়ে শিশুশ্রেণিতে ভর্তির সংখ্যা পাঁচ লাখ বেড়েছে। সরকারি তথ্যে দেখানো হয়েছে, শতকরা ৯০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা উইঘুর ও অন্য মুসলিম সংখ্যালঘু শিশু। জিনজিয়াংয়ের নার্সারি শ্রেণির শিশু ভর্তির সংখ্যা জাতীয় যে গড় তার নিচে ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের পর হঠাৎ এত শিশু নার্সারি শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে যে, সংখ্যার দিক থেকে জিনজিয়ান এখন সবার ওপরে।

জিনজিয়াংয়ের দক্ষিণে যেখানে উইঘুরদের সবচেয়ে বেশি ঘনবসতি, কেবল সেখানেই ভবন ও কিন্ডারগার্টেন উন্নয়নে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে চীন। গবেষক জেনজের বিশ্লেষণ এটাই নির্দেশ করে যে, এইসব বড় বড় ভবনে বিশাল জায়গাজুড়ে ডরমেটরিও রয়েছে। জিনজিয়াংয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। একইভাবেই প্রাপ্তবয়স্কদের গণ কারাদন্ডের ব্যবস্থাও প্রসারিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। উইঘুরিয়ান ও অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদেরও এই পরিকল্পিত শিক্ষা শিবিরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবার তাদের বাবা-মাকে বন্দিশিবিরে নেওয়া হোক বা না হোক।

জিনজিয়াংয়ের দক্ষিণে অবস্থিত ইয়াচেং শহরে ২০১৮ সালে দুটি নতুন আবাসিক স্কুলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ওই দুটি স্কুলকে একটি যৌথ খেলার মাঠ দিয়ে বিভক্ত করা হয়েছে। আর এই স্কুলটি দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত স্কুলের চেয়ে অনেক বড় এবং মাত্র এক বছরে এগুলো নির্মাণ হয়েছে। আর গত বছরের এপ্রিলে শহরটির বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ ইয়েচেংয়ে অবস্থিত অন্য একটি বড় আবাসিক মাধ্যমিক স্কুলে অন্তত দুই হাজার শিশুকে আশপাশের গ্রাম থেকে এনে ভর্তি করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ওই মাধ্যমিক স্কুলের বিষয়ে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হয় এবং গুণকীর্তন করা হয়। প্রচারণার সময় তারা বলছে, আবাসিক স্কুলগুলো ‘সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায়’ রাখতে সাহায্য করছে এবং বাবা-মায়ের দায়িত্বগুলো স্কুলগুলো পালন করছে। তবে গবেষক জেনজ তার গবেষণায় এসব স্কুলের গভীর দুরভিসন্ধি আছে বলে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, সংখ্যালঘু সমাজের সংস্কৃতি যেন টিকে না থাকে এবং তা যেন বদলে ফেলা যায় সে ব্যাপারে আবাসিক স্কুলগুলো মতাদর্শিক আনুষাঙ্গিক বিষয়াদি বিতরণ করছে।

তার গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বন্দিশিবিরের মতোই ওই সব স্কুল প্রাঙ্গণে উইঘুর ও স্থানীয় ভাষার ব্যবহার বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি স্কুলে নিজস্ব নিয়ম-নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে মান্দারিন ছাড়া কথা বললে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

এই তথ্য প্রমাণের সঙ্গে সরকারি ভাষ্য যোগ করলে এটা বলাই যায় যে, জিনজিয়াংয়ের সব স্কুলে মান্দারিন ভাষা শিখানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশ্য জিনজিয়াংয়ের প্রচারণা (প্রোপাগান্ডা) বিভাগের জ্যেষ্ঠ এক সরকারি কর্মকর্তা জু গুইজিয়াং বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় এইসব বিষয় অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘বাবা-মা ফেলে গেছেন এমন এতিম হওয়া অনেক শিশুদের দেখভাল করছে সরকার।’

তিনি বলেন, ‘যদি একটি পরিবারের সব সদস্যদেরই কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হতো তবে ওই পরিবার কঠিন সমস্যায় পড়তো।’ এ সময় তিনি হাসতে হাসতে বলেন, এই ধরনের কোনো ঘটনা আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু মি. জেনজের কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা যে, তার তথ্য-প্রমাণে দেখানো হয়েছে, আটককৃত বাবা-মায়েদের সন্তানদের আবাসিক স্কুলে পাঠানো হয়েছে।

শিবিরের চারপাশে তারের বেড়া। স্থানীয় প্রশাসন এক ধরনের ফরম ব্যবহার করে যেগুলোতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা কারাগারে থাকা বাবা-মায়ের সন্তানদের সম্পর্কে বিস্তারিত পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি এইসব শিশুদের দেখভালের কথাও বলা হয়ে থাকে। জেনজ এমন একটি সরকারি প্রমাণ পেয়েছেন যেখানে ‘দরিদ্র গোষ্ঠী’র জন্য বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি অঢেল। এই গোষ্ঠীর মধ্যে সেইসব পরিবারও আছেন যাদের স্বামী-স্ত্রী দুইজনই কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আছেন।

আর সেই সব পরিবারের সন্তানদের দেখভাল করার জন্য শিক্ষা বিভাগকে সরকারের তরফ থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। শুধু দেখভাল না গুরুত্বের সঙ্গে দেখভালেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্কুলগুলোতে মানসিক কাউন্সিলিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামর্থবান করে তুলতে হবে। একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া আছে শিবিরে থাকা তাদের বাবা-মায়ের ক্ষেত্রেও।

এটা পরিষ্কার যে শিশুদের গণহারে এই বন্দীত্বকে এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এই জন্য তারা কিছু সুযোগ সুবিধাও দিচ্ছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে কিছু প্রকাশে কর্তৃপক্ষ আগ্রহী না। এদিকে কিছু সরকারি তথ্য দেখে মনে হচ্ছে, তারা ইচ্ছা করেই ‘কারিগরি প্রশিক্ষণ’ টার্মটির ক্ষেত্রে গোপন প্রতীক ব্যবহার করে সার্চ ইঞ্জিনে সেটি গোপন করেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের শিবিরগুলো কিন্ডারগার্টেনের কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছে।

আর যখন শিবিরগুলো পরিদর্শন করা হয়ে তখন রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এইসব বিষয়ে ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। তারা বলে এইসব আবাসিক স্কুলগুলোতে সংখ্যালঘু সন্তানদের ‘উন্নত জীবনের অভ্যাস’ বিষয়ে শেখানো হয় এবং তাদের বাড়ির চেয়ে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রয়েছে সেখানে। এখন দেখা যাচ্ছে কিছু শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের ‘মা’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করেছে। এসব বিষয়ে সরকারি কৌশল সম্পর্কে জানতে জিনজিয়াংয়ে অবস্থিত এমন বেশ কয়েকটি শিক্ষা বিভাগে ফোন করা হয়।

বেশিরভাগই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়নি। অবশ্য কয়েকজন এই ব্যাপারে ভাসা ভাসা কিছু কথা বলেছেও। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, যেসব বাবা-মাকে বন্দিশিবিরে নেওয়া হয়েছে তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে? উত্তরে এক নারী কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা আবাসিক স্কুলে আছে। আমরা তাদের থাকা, খাওয়া ও পোশাক দিচ্ছি। উচ্চ পর্যায় থেকে আমাদের বলা হয়েছে আমরা যেন তাদেরকে ভালোভাবে দেখভাল করি।’

ইস্তাম্বুলের ওই হলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারের গল্পগুলিতে তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। ছিল হতাশা ও ক্ষোভও। এক মা বলেন, ‘হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত সেইসবের প্রমাণ দিচ্ছি। এসব জানার পরও বিশ্ববাসী কেন কিছু বলছে না।’ শিবিরের লকারের চীনের পতাকার লোগো। আর জেনজের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, জিনজিয়াংয়ের স্কুলগুলিতে থাকা শিশুরা এখন বুঝতে পেরেছে যে।

প্রকৃতপক্ষে কর্তৃপক্ষ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাদেরকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। বেশিরভাগ স্কুলেই শতভাগ নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং ১০ হাজার ভোল্টের ইলেক্টি্রক তারে চারদিকে বেড়া দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে আছে অ্যালার্ম সিস্টেমও। কিছু কিছু স্কুলে তো নিরাপত্তার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের বন্দিশিবির থেকেও বেশি অর্থ খরচ করা হয়েছে। চীন শিশুদের জন্য এইসব কর্মপন্থা ও কৌশল চালু করে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে, যখন নাটকীয়ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের আটক শুরু হয়।

জেনজ এই বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, ওই রাষ্ট্রে এখন উইঘুর বাবা-মার পক্ষে জোর চেষ্টা চালিয়েও কি তাদের সন্তানদের ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে? জেনজ বলেন, ‘আমি মনে করি কৌশলগতভাবে সন্তানদের তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার অর্থই বলে দেয় জিনজিয়াংয়ে চীনা সরকার কি করতে চাইছে। তারা চাইছে জিনজিয়াংয়ে নতুন এক প্রজন্ম বেড়ে উঠুক যাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম, ভাষা এবং সর্বোপরি শেকড়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’তিনি বলেন, ‘এই প্রমাণগুলি সাংস্কৃতি গণহত্যার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে আমি মনে করি।’

Leave a Reply

[X]