বোনের স্মৃতিতে আস্ত হাসপাতাল গড়লেন ট্যাক্সি ড্রাইভার দাদা

পেশায় ট্যাক্সি চালক সাইদুল লস্কর। বাড়ি কলকাতা থেকে ৫৫ কিমি দূরে পুনরিতে। রোজগার দিনের শেষে খুব হলে ৫০০টাকা। সবদিন তাও জোটে না। কিন্তু তবুও সাইদুল তার লক্ষ্যে অবিচল থেকেছে ১২বছর। হাঁ ১২ বছর ধরে তিল তিল করে জমিয়েছে টাকা। ট্যাক্সি চালিয়ে, ঘর সংসার করে হাতে দিনের শেষে পড়ে থাকে জোরের উপর ১০০টাকা। কিন্তু তবুও সাইদুল হার মানে নি। তার ১৭বছরের বোনকে ২০০৪ সালে সে বাঁচাতে পারে নি তার একমাত্র বোনকে। তার বোনের বুকে সংক্রমণ হয়েছিল। কিন্তু বাড়ির সামনে কোনো হাসপাতাল না থাকার জন্য সে বোনকে বাঁচাতে পারে নি।আর তারপর থেকেই সে মনস্থির করে যে সে যেমন করেই হোক একটা হাসপাতাল তৈরি করবে। চোখের সামনে আপন লোক মারা যাবে না আর।

তবে পণ করলেই হয় না। চাই দৃঢ়তা, চাই আত্মবিশ্বাস,চাই ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা। তবে মনের জোর যেকোনো অসাধ্য কাজকেও সাধ্য করে তুলে। ৫৫বছর বয়সী সাইদুল সেই অসাধ্য কাজকেই করেছে সাধ্য। আজ তার চোখের সামনেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে পেরেছে সাইদুল। তৈরি হয়েছে তার হাসপাতাল। তিনি এই হাসপাতালের নাম রেখেছেন তার বোনের নামে। “মারুফা স্মৃতি ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন”হল সেই স্বপ্নের হাসপাতাল। আর সেই হাসপাতালে বহির্বিভাগে রোগী দেখার কাজও শুরু হয়েছে গত শনিবার থেকে। যদিও বহির্বিভাগএখন ৬ শয্যা বিশিষ্ট , তবে আগামী ছয় মাসের তা ৩০ শয্যা বিশিষ্ট করার পরিকল্পনা ও ইচ্ছা আছে সাইদুলের। এই হাসপাতাল বর্তমানে পাশাপাশি একশটি গ্রামের লোকেদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেবে।

তবে এই হাসপাতাল তৈরির কথা বলতে গিয়ে সাইদুলের চোখে জল চলে এসেছিল। তার কথায়,”একজন সামান্য ট্যাক্সি চালক যখন একটা আস্ত হাসপাতাল তৈরি করার কথা ভাবে, তখন বেশিরভাগ লোকই তাকে পাগল বলতে শুরু করে। প্রথমে তিনি যারা তার ট্যাক্সিতে ভাড়া নিত তাদের কাছেই অর্থ সাহায্যের আবেদন করতে।অনেকেই তার ইচ্ছার কথা শুনে ভাওতাবাজি ভাবতে। আবার অনেকেই ১০,২০,৫০বা ১০০টাকাও সাহায্য করেছে। আর এইভাবেই তার পথ চলা শুরু। এই রকমই একজন যাত্রী ছিল সৃষ্টি ঘোষ। সে তার মাকে নিয়ে সাউথ সিটি থেকে আসছিল সাইদুলের গাড়িতে চেপে। সাইদুল যখন তার কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন করে।তখন সে মাত্র ১০০টাকা দিয়ে প্রথম সাহায্য করেছিল।এবং সাইদুলের কাছ থেকে তার মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে নিয়েছিল।পরে জুন মাসে সৃষ্টি তার একমাসের গোটা বেতনটাই সাইদুলের মহান কাজে দিয়েছিল।সাইদুল সৃষ্টির মধ্যে তার বোনকে দেখতে পাই।”তাই এই হাসপাতালের উদ্ঘাটন হয়েছে সাইদুলের পাতানো বোন সৃষ্টির হাতেতবে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে।

হাসপাতাল তৈরির জন্য তার প্রথমেই দরকার পড়ে অনেকটা জমির। জমি কেনার জন্য তার কাছে সেই বিশাল টাকা ছিল না। তখন সাহায্যের হাত বাড়ায় তার স্ত্রী। তিনি তার যাবতীয় অলঙ্কার সাইদুলকে দিয়ে দেন জমি কেনার জন্য। এইভাবেই তার দুই বিঘা জমি কেনার জন্য ৩ লাখ টাকার জোগাড় হয়। তারপর তিল তিল করে আস্তে আস্তে হাসপাতালের বাড়ি তৈরি হতে থাকে। পাশাপাশি গ্রামের লোকেরাও তাকে নানান ভাবে সাহায্য করেছে।হাসপাতালটি তৃতীয় তল বিশিষ্ট এক হাসপাতাল করা হবে বলে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে নিচের তলায় আছে বহির্বিভাগ। আর মাঝের তলায় থাকবে প্যাথলজিক্যাল ল্যাব। সবচেয়ে উপরের তলায় থাকবে ২০শয্যার মেঝে। এখনও পর্যন্ত সাইদুল হাসপাতাল তৈরিতে ৩৬লক্ষ টাকার মতো খরচ করেছে।

উপর ও মাঝের তলার কাজ এখনো চলছে।তবে তার একার পক্ষে এতো বড় কাজ সম্ভব নয়। তাই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে অনেক সংস্থা। এইরকমই একটি সংস্থা তার হাসপাতালের জন্য দিয়েছে এক্স রে মেশিন ও ই সি জি মেশিন। সাইদুলের মতে তিনি চান এমন এক হাসপাতাল যেখানে সাধারণ মানুষ ন্যুনতম অর্থ খরচ করে প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিষেবা পায়। আর তার সেই ইচ্ছাও আজ পূরণ হওয়ার পথে। জয় চৌধুরী,সিরেশ চৌধুরী প্রমুখ ডাক্তারেরা এখানে বিনা মূল্যে তাদের পরিষেবা দেবেন বলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও “বাঁচবো”বলে এক সমাজসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে সাহায্যের হাত নিয়ে। সাইদুল আজ হয়ে উঠেছে এক প্রকৃত মানবদরদী সত্তা,যা ছাড়িয়ে গিয়েছে হিন্দু মুসলমানের চেনা পরিচিত ধর্মের নোংরামির পথ। আর এইখানেই সাইদুল হয়ে উঠেছে এক বিশ্ব বাঙালী। আমার ও ইচরেপাকার পক্ষ থেকে রইল অনেক অনেক শুভেচ্ছাবার্তা।

আমরা সবাই যদি এইভাবেই নিজেদের মধ্যে অনেক সাইদুলকে খুঁজে নিতে পারি তাহলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ মানুষও পাবে স্বাস্থ্যের যত্ন ও স্বাস্থ্য রক্ষার পরিষেবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*